ইসলামের পাঁচ খুঁটি হেফাজত করাই আমাদের উদ্দেশ্য : আল্লামা শফী

নয়াদিগন্ত : ২৪/১১/২০১৩
হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশের আমির আল্লামা শাহ্ আহমদ শফী বলেছেন, ইসলামের পাঁচ খুঁটি তথা কালিমা, নামাজ, রোজা, হজ ও জাকাতকে হেফাজত করা সব মুমিন নর-নারীর ওপর ফরজ। এই পাঁচ খুঁটি হেফাজত করাই হলো হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশের আসল উদ্দেশ্য। গত শুক্রবার বিকেলে রাঙ্গুনিয়ার কোদালা হাইস্কুল মাঠে ইত্তেহাদে ওলামায়ে ইসলাম কোদালার উদ্যোগে মুফতি আব্দুল কাদেরের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত দুই দিনব্যাপী তাফসির মাহফিলের সমাপনী দিবসে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি হেফাজতে ইসলামের ল্য-উদ্দেশ্য এবং আস্তিক-নাস্তিকের পার্থক্য তুলে ধরেন। আল্লামা শাহ্ আহমদ শফী বাদ জুমা হাটহাজারী মাদরাসা থেকে কোদালা আজিজিয়া মাদরাসায় মাগরিবের আগে পৌঁছান। মাদরাসা মিলনায়তনে এক সংপ্তি অনুষ্ঠানে হাজার হাজার মানুষের উপস্থিতিতে তাকে সংবর্ধনা দেয়া হয়।
মাগরিবের পর তাকে শত শত তৌহিদী জনতা ও মোটরসাইকেল বহরে মাহফিলে আনা হয়। মঞ্চে ওঠার পর পরই মাহফিলের চতুর্দিকে মানুষে কানায় কানায় পূর্ণ হয়ে যায়। অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে ছিলেন আল্লামা মুফতি আব্দুল হালীম বুখারী, ড. আ ফ ম খালেদ হোসেন, আল্লামা ওবাইদুল্লাহ হামযা, মোফাসসিরে কুরআন আল্লামা এয়াকুব কাছেমী, জামিয়া পটিয়ার মহাপরিচালক শায়খুল হাদিস সৈয়দ আলম আরমানী। এ ছাড়াও উপস্থিত ছিলেন হাফেজ মাওলানা জাফর সাদেক, মাওলানা আবুল ফয়েজ আনছারী, মাওলানা ইছহাক, মাওলানা নুরুল আজিম, ক্বারী ইদ্রিছ, আনাছ মাদানী, হাবিবুল্লাহ, নাজমুল হক, মাওলানা রফিক প্রমুখ। আল্লামা শাহ্ আহমদ শফী আরো বলেন, নাস্তিকদের বিরুদ্ধে কথা বললে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কেন মাথাব্যথা হয়ে যায়, তা আমার বোধগম্য নয়। আমাদের প্রধানমন্ত্রীর দু’টি শব্দ মুখস্থ আছে। একটি মৌলবাদী, অপরটি জঙ্গিবাদী। এই দু’টি শব্দ সম্পর্কে প্রধানমন্ত্রী নিজেও জানেন না। আমরা কোনো রাজনৈতিক দল নই। হেফাজতে ইসলামকে ব্যবহার করে কেউ রাজনৈতিক ফায়দা লুটতে পারবে না। হেফাজত আমিরের দোয়া নয়, বদদোয়া নিয়ে গেছেন এরশাদ : বাবুনগরী হাটহাজারী সংবা“াতা জানান, হেফাজত আমিরের সাথে সাক্ষাৎ করতে এসে জাতীয় পার্টি চেয়ারম্যান হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ আল্লামা শাহ আহমদ শফীর দোয়া নয়, বরং বদদোয়াই নিয়ে গেছেন। হেফাজত আমির মাঠে-ময়দানে যারা ইসলামের পক্ষে কাজ করছেন, তাদের সাফল্য কামনা করে দোয়া করেছিলেন। জাতীয় পার্টি চেয়ারম্যানের বর্তমান রাজনৈতিক যে অবস্থান, তাতে এটা কখনোই তার জন্য দোয়া বলা যায় না, বরং বদদোয়াই বলতে হয়। গতকাল শনিবার বিভিন্ন দৈনিক সংবাদপত্রে প্রেরিত এক বিবৃতিতে হেফাজতে ইসলামের কেন্দ্রীয় মহাসচিব আল্লামা জুনায়েদ বাবুনগরী এ মন্তব্য করেন। বিবৃতিতে তিনি বলেন, ১৭ নভেম্বর বেলা সাড়ে ১১টায় জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ হেফাজত আমির আল্লামা শাহ আহমদ শফীর সাথে তার কার্যালয়ে সৌজন্য সাক্ষাতে মিলিত হন। বৈঠকে হেফাজতে ইসলামের অন্য নেতৃবৃন্দের সাথে মহাসচিব হিসেবে আমিও উপস্থিত ছিলাম। কুশল বিনিময় শেষে হেফাজত আমির এরশাদকে ঈমান-আমল ও ইসলামের ওপর চলার জন্য হিদায়াতি বিভিন্ন উপদেশ দেন। পাশাপাশি ইসলামবিদ্বেষী নাস্তিক্যবাদিদের বিভিন্ন অপতৎপরতার কথা তুলে ধরে এরশাদকে তার দলীয় অবস্থান থেকে ইসলাম ও মুসলমানদের পক্ষে কাজ করার আহ্বান জানান। হেফাজত আমির আল্লামা শাহ আহমদ শফী এরশাদকে উদ্দেশ করে আরো বলেছিলেন, দেশে যে হারে ইসলাম ও মুসলমানদের ওপর একের পর এক আঘাত হানা হচ্ছে, তা কোনোভাবেই মানা যায় না। সরকার কুরআন-সুন্নাহবিরোধী কোনো আইন পাস করবে না বলে ক্ষমতায় এলেও ইসলাম অবমাননাকারীদের কোনো বিচার করছে না। সংবিধান থেকে আল্লাহর উপর আস্থা ও বিশ্বাসের ধারাকে বাদ দেয়া হয়েছে এবং শিক্ষা-সংস্কৃতিকসহ সর্বস্তরে উদ্বেগজনক হারে ইসলামের ওপর আঘাত হানা হচ্ছে। জাতীয় পার্টি চেয়ারম্যান এরশাদ তখন বলেছিলেন, ‘রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম ও ধর্মীয় শিক্ষাসহ বিভিন্ন স্তরে জাতীয় পার্টির বিগত সরকার ইসলামের পক্ষে কাজ করেছিল’। এরশাদ আরো বলেছিলেন, ‘বর্তমান সরকার সংবিধান থেকে আল্লাহর উপর আস্থা ও বিশ্বাসের ধারা বাদ দিয়েছে। আমি প্রতিবাদ করলে তারা জানায় যে, নাস্তিকদের চাপে তারা এটা করতে বাধ্য হয়েছে। কিন্তু রাষ্ট্র ধর্ম ইসলামকে বাদ দিতে আমি দেইনি।’ এরশাদ আরো বলেছিলেন, ‘আওয়ামী লীগ সরকার আবার ক্ষমতায় এলে মসজিদে আজান দেয়া বন্ধ করে দেবে। ওয়াজ-মাহফিল নিষিদ্ধসহ ইসলামবিরোধী অনেক কাজ শুরু হয়ে যাবে। মাদরাসা শিক্ষা বন্ধসহ আলেম-ওলামাদেরকে ইসলামের পক্ষে কাজ করতে দেবে না। আওয়ামী লীগ আবার ক্ষমতায় এলে দেশে ইসলাম থাকবে না।’ বিবৃতিতে আল্লামা হাফেজ মুহাম্মদ জুনায়েদ বাবুনগরী বলেন, এ সময় সংগঠনের মহাসচিব হিসেবে এরশাদকে হেফাজতে ইসলামের অরাজনৈতিক অবস্থান ও ঈমান-আকিদা ভিত্তিক আদর্শিক আন্দোলন সম্পর্কে অবহিত করে আমি বক্তব্য দিয়েছি। এরশাদকে তখন আরো বলেছিলাম, ঈমান-আকিদার সুরক্ষা এবং দেশের স্থিতিশীলতার স্বার্থে হেফাজতের ১৩ দফা দাবি বাস্তবায়নে সমর্থন ও ভূমিকা রাখার জন্য দলমত নির্বিশেষে আমরা সবার প্রতি আহ্বান জানিয়ে থাকি। আগামীতে যারাই সরকার গঠন করুক, হেফাজতে ইসলামের ১৩ দফা বাস্তবায়নে তাদেরকে কাজ করতে হবে। হেফাজতে ইসলাম সম্পূর্ণ অরাজনৈতিক ঈমান-আকিদা ভিত্তিক একটি ইসলামি সংগঠন। কোনো সুনির্দিষ্ট রাজনৈতিক দল বা জোটের প্রতি আমাদের সমর্থন নেই। এরশাদকে ইসলাম ও মুসলমানদের পক্ষে কাজ করার জন্য তখন আমিও স্পষ্ট আহ্বান জানিয়েছিলাম। আল্লামা জুনায়েদ বাবুনগরী বলেন, হেফাজতে ইসলামের অরাজনৈতিক দৃঢ় অবস্থানের কথা জেনে এরশাদ তার প্রতি হেফাজতের সমর্থন কামনার কোনো সুযোগই না পেয়ে বলেছিলেন, আমি সমর্থন লাভের জন্য নয়, হুজুরের দোয়া নেয়ার জন্য এসেছি। দোয়ার সময় হুজুর এরশাদের মনের সৎ উদ্দেশ্য কবুল এবং যারা ইসলাম ও মুসলমানদের পক্ষে কাজ করবে, তাদের সাফল্যের জন্য দোয়া করেছিলেন। দোয়া করার সময় হেফাজত আমির ইসলামবিদ্বেষী নাস্তিক্যবাদ ও তাদের দোসরদের থেকে বাংলাদেশকে হেফাজত করার অথবা তাদেরকে ধ্বংস করার জন্যও দোয়া করেছিলেন। আল্লামা জুনায়েদ বাবুনগরী আরো বলেন, হেফাজত আমির একজন খুবই উঁচু মাপের আধ্যাত্মিক ধর্মীয় গুরু ও বুজুর্গ ব্যক্তিত্ব। ওলামা-মাশায়েখ ও তৌহিদি জনতার কাছে তার দোয়ার গুরুত্ব অত্যধিক। তিনি যে শর্তে এরশাদ সাহেবকে দোয়া করেছিলেন, তাতে এরশাদ সাহেবের বর্তমান রাজনৈতিক ভূমিকা ও তৎপরতায় এটা তার জন্য বদদোয়া হিসেবেই সাব্যস্ত হচ্ছে। এরশাদ ইসলাম ও মুসলমানদের পক্ষে নানা মুখরোচক বুলি আওড়ালেও কার্যক্ষেত্রে বর্তমানে তার ইসলামবিরোধী ভূমিকাই জাতির কাছে স্পষ্ট হয়েছে।