হেফাজত এগোচ্ছে শান্তিপূর্ণ পন্থায


আবারো ঘুরে দাঁড়াচ্ছে হেফাজতে ইসলাম। সংবিধানে আল্লাহর ওপর আস্থা ও বিশ্বাসের নীতি পুনঃস্থাপন, নাস্তিক ব্লগারদের শাস্তিসহ ১৩ দফা দাবি আদায়ে আবারো সক্রিয় হচ্ছে সংগঠনটি। দাবির পক্ষে আরো ব্যাপক জনমত সৃষ্টি করে দাবি আদায়ে নতুন কৌশলে এগোচ্ছে শীর্ষ আলেমদের নেতৃত্বাধীন এই সংগঠন। সঙ্ঘাত-সংঘর্ষ এড়িয়ে শান্তিপূর্ণভাবে দাবি আদায়ের আগের নীতিতেই আন্দোলন চলবে বলে জানিয়েছেন নেতারা। আপাতত বড় কর্মসূচিতে না গিয়ে সরকারের পক্ষ থেকে দায়ের করা মামলা মোকাবেলা করে শীর্ষ নেতাদের প্রকাশ্যে মাঠে ময়দানে নিয়ে আসার বিষয়টিকে গুরুত্ব দেয়া হচ্ছে। পাশাপাশি দোয়া, গণসংযোগ ও বিক্ষোভের মতো কর্মসূচি অব্যাহত রাখা হবে। আগামী মাসে সারা দেশে কওমি মাদরাসাগুলোর পরীক্ষা থাকায় বড় ধরনের কর্মসূচির দিকে না যাওয়ার অন্যতম কারণ।

হেফাজতের কেন্দ্রীয় ও ঢাকা মহানগরীর বেশ কয়েকজন নেতার সাথে কথা বলে জানা গেছে, ৫ ও ৬ মে শাপলা চত্বরের ঘটনার ধকল কাটিয়ে উঠতে আরো কয়েক দিন সময় লাগবে। অসংখ্য আহত ব্যক্তির চিকিৎসা নিয়ে হিমশিম খেতে হচ্ছে এখনো। পুলিশি হয়রানির ভয়ে অনেক নেতাকর্মীকে গোপনে চিকিৎসা দিতে হচ্ছে। এরই মধ্যে সরকারের পক্ষ থেকে দায়ের করা মামলার কারণে শীর্ষ নেতারা আত্মগোপনে রয়েছেন। কেন্দ্রীয় মহাসচিব আল্লামা জুনায়েদ বাবুনগরীকে দফায় দফায় রিমান্ডে নিয়ে অন্য নেতাদের ওপর মনস্তাত্তিক চাপ সৃষ্টি করা হচ্ছে। এই পরিস্থিতি কাটিয়ে ওঠার জন্য আরো কিছু সময় নেয়া হচ্ছে বলে তারা জানান। নেতারা পরস্পরের সাথে কথা বলে করণীয় ঠিক করার চেষ্টা করছেন।
তবে অপেক্ষাকৃত তরুণ নেতাদের নেতৃত্বে আবারো কর্মসূচিতে আসতে শুরু করেছে হেফাজত। গতকাল জুমার নামাজের পর চট্টগ্রাম আন্দরকিল্লা জামে মসজিদের সামনে বিক্ষোভ মিছিল বের করে হেফাজত, যদিও পুলিশ সমাবেশে বাধা দেয় এবং মাইক কেড়ে নেয়।
হেফাজতের কেন্দ্রীয় নেতা মুফতি হারুন ইজহার এ ব্যাপারে বলেন, হেফাজতে ইসলাম থেমে যায়নি এবং থামবে না। তিনি চট্টগ্রামের আন্দরকিল্লায় গতকালের মিছিলের কথা উল্লেখ করে বলেন, ১৩ দফা দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত আন্দোলন চলতে থাকবে। তিনি বলেন, সরকারের দায়ের করা মামলার কারণে শীর্ষ নেতারা প্রকাশ্যে কর্মসূচিতে অংশ নিতে না পারলেও তরুণ নেতারা আপাতত আন্দোলন এগিয়ে নিয়ে যাবেন। জানা গেছে, আল্লামা বাবুনগরীসহ সারা দেশে গ্রেফতারকৃত আলেমদের মুক্তির জন্য কঠোর কর্মসূচির হুমকি দিয়ে দাবি জানানো হবে দু-এক দিনের মধ্যে।
হেফাজত নেতারা জানান, হেফাজতে ইসলাম সরকারের সাথে কোনোভাবেই সঙ্ঘাত সংঘর্ষে যাওয়ার নীতিতে ছিল না। কিন্তু ৫ মে ঢাকা অবরোধ-পরবর্তী সমাবেশকে কেন্দ্র করে সরকার হঠাৎ কেন আক্রমণাত্মক আচরণ করল হেফাজত নেতারা এখনো তার হিসাব মিলাতে পারছে না। হেফাজতের সাথে সরকার ৫ মে সকাল পর্যন্ত যে আচরণ করেছে তাতে সরকার তাদের ওপর এমন কঠোর আচরণ করতে পারেÑ এমন ধারণা করেননি কেউ। সরকার আতঙ্কিত হয়ে এভাবে নিরীহ আলেমদের ওপর আক্রমণ করে নিজেদেরই ক্ষতি করেছে বলে হেফাজতের অনেক নেতা মনে করছেন। আবার অনেকে সরকারের এই আক্রমণকে পরিকল্পিত আখ্যায়িত করে বলেছেন, মূলত শাহবাগী বামদের চক্রান্তে সরকারের একটি মহল ইসলামি শক্তিকে দমিয়ে রাখার জন্য হেফাজতের ওপর এই সাঁড়াশি অভিযান চালিয়েছে।
হেফাজত নেতারা মনে করছেন, ৫ মে ঢাকা অবরোধ-পরবর্তী শাপলা চত্বরে অবস্থান কর্মসূচিতে যৌথবাহিনীর সাঁড়াশি অভিযানের মতো ভয়াবহ ঘটনায় বড় ধরনের হোঁচট খেলেও এতে আন্দোলনের মূল উদ্দেশ্য সফল হয়েছে। নেতারা বলছেন, সরকার নৈতিকভাবে হেফাজতের দাবির কাছে পরাজিত হয়েছে এবং গণজোয়ারকে ভয় পেয়েই নিরীহ ঘুমন্ত মানুষের ওপর সশস্ত্র অভিযান পরিচালনা করেছে। এতে হেফাজতের দাবির যৌক্তিকতা আরো জোরালোভাবে প্রমাণিত হয়েছে।
ওই দিনের হতাহতের সংখ্যা এখনো হেফাজতের পক্ষ থেকে না জানানোর ব্যাপারে জানতে চাইলে হেফাজতের একাধিক নেতা জানান, তথ্য সংগ্রহের চেষ্টা চলছে। তবে অনেকে পুলিশি হয়রানির ভয়ে তথ্য দিতে চাইছেন না। আর কেন্দ্রীয় নেতারা প্রকাশ্যে ময়দানে আসতে না পারার কারণেও তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহে সময় লাগছে বলে নেতারা জানান।
হেফাজতের ঢাকা মহানগরীর যুগ্ম আহ্বায়ক মাওলানা আবদুর রব ইউসুফীর কাছে হেফাজতের ভবিষ্যতের ব্যাপারে জানতে চাইলে তিনি বলেন, হেফাজত শেষ হয়ে যায়নি। কেন্দ্রীয় আমির আল্লামা শফীর নির্দেশে আমরা আপাতত বড় কর্মসূচিতে যাচ্ছি না। আমরা আহতদের চিকিৎসা এবং পরিস্থিতি স্বাভাবিক হওয়ার জন্য কিছু সময় নিচ্ছি। তিনি বলেন, আমরা সরকারের সাথে সংঘর্ষে জড়াইনি। সরকারই আমাদের ওপর হামলা করে আমাদের শহীদ করেছে, আহত করেছে। ওই দিন পল্টন এলাকায় সংঘর্ষের ঘটনার পেছনে পুলিশ ও সরকারি দলের নেতাকর্মীদের উসকানি ছিল। আমরা এখনো আগের সিদ্ধান্তে অটল আছি। আমাদের ১৩ দফা ঈমানি দাবি। এই দাবি আমরা শান্তিপূর্ণভাবে করে যাব আদায় না হওয়া পর্যন্ত। আমাদের আন্দোলনের সাথে রাজনীতির কোনো সম্পর্ক নেই। তিনি বলেন, হেফাজতের আন্দোলনের সাথে রাজনৈতিক সম্পর্ক থাকলে হেফাজত ঘটনার পরপরই পুরো দেশ অচল করে দেয়ার মতো কর্মসূচি দিতে পারত। কারণ দেশের বেশির ভাগ মানুষ হেফাজতের আন্দোলনের সমর্থক। আর হেফাজতের ওপর ৫ মে রাতে যে নৃশংস হামলা করে অসংখ্য মানুষকে শহীদ করা হয়েছে। তার জন্য পুরো দেশের মানুষের হৃদয়ে রক্তক্ষরণ হচ্ছে। তিনি বলেন, আমাদের ধৈর্য্য ও শান্তিপ্রিয়তাকে সরকার দুর্বলতা ভাবলে ভুল করবে। আলেমদের মামলা হামলা ও ভয়ভীতি দেখিয়ে আন্দোলন থেকে বিরত রাখার চেষ্টা করছে সরকার। এই অবস্থা বেশি দিন স্থায়ী হবে না। সারা দেশে হেফাজতের আন্দোলনের পক্ষে যে জনসমর্থন রয়েছে এবং হেফাজতের ওপর আক্রমণ করে যে ক্ষোভের সৃষ্টি করেছে তা বেশি দিন দমিয়ে রাখা যাবে না। অবিলম্বে হেফাজত নেতাদের হয়রানি বন্ধ করে ঈমানি দাবি মেনে নেয়ার জন্য হেফাজতের এই নেতা সরকারের প্রতি আহ্বান জানান।
হেফাজতের কেন্দ্রীয় যুগ্ম মহাসচিব মাওলানা জাফরুল্লাহ খান এ ব্যাপারে নয়া দিগন্তকে বলেন, ৫ মের ঘটনার মূল্যায়ন চলছে। করণীয় ঠিক করা হচ্ছে। হেফাজত শেষ হয়ে যায়নি এবং যাবে না ইনশা আল্লাহ। হেফাজতের ১৩ দফা কুরআন-সুন্নাহভিত্তিক। এই ১৩ দফার আন্দোলন চলতে থাকবে। তিনি বলেন, আমরা ওই দিনের ঘটনায় আসলে হতভম্ব। এমনভাবে ঘটনা ঘটেছে যে, হতাহতের সঠিক পরিসংখ্যান পেতেও বেগ পেতে হচ্ছে। তবে পরিসংখ্যান তৈরির কাজ চলছে। তিনি বলেন, আমরা মনে করি সরকার নিজেরই ক্ষতি করেছে। দেশের কোনো মানুষ এই আক্রমণকে স্বাভাবিক মনে করছে না। তিনি বলেন, সরকার এক দিকে আলেমদের ওপর নির্মম হত্যাকাণ্ড চালিয়েছে, অন্য দিকে এখন মামলা দিয়ে গ্রেফতার নির্যাতন করে হয়রানি করছে। জুলুমের ওপর জুলুম করছে। এ ধরনের আচরণ কাম্য হতে পারে না। দেশের ধর্মপ্রাণ মানুষ সরকারের এ আচরণে ুব্ধ।
হাটহাজারী মাদরাসা সূত্র জানিয়েছে, হেফাজতের বিরুদ্ধে দায়ের করা সরকারের মামলা মোকাবেলায় ইতোমধ্যেই আইনজীবী নিয়োগ দেয়া হয়েছে। এ ছাড়া আল্লামা বাবুনগরীর মুক্তি না হওয়া পর্যন্ত কেন্দ্রীয় ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব নিয়োগ দেয়ার চিন্তা চলছে। সূত্র জানায়, হেফাজতে ইসলাম যাতে কঠোর কর্মসূচি দিতে না পারে জন্য সরকারের তরফে বিভিন্নভাবে কেন্দ্রীয় নেতাদের ওপর মানসিক চাপ প্রয়োগ অব্যাহত রয়েছে। অন্য দিকে সারা দেশের আলেম ওলামাদের পক্ষ থেকে কর্মসূচি দেয়ার জন্য প্রচণ্ড চাপ আসছে। আল্লামা শাহ আহমদ শফী এই পরিস্থিতিতে মধ্যপন্থা অবলম্বন করে পরিস্থিতি স্বাভাবিক করার ব্যাপারে নেতাদের দিকনির্দেশনা দিয়েছেন। বিশেষ করে আগামী মাসে কওমি মাদরাসার পরীক্ষা থাকায় সেই দিকটিও সামনে রাখা হচ্ছে।
উল্লেখ্য আল্লামা শাহ আহমদ শফী কওমি মাদরাসা শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যানের দায়িত্বেও রয়েছেন।