রাষ্ট্রব্যবস্থায় শান্তি আনয়নে ইসলাম
মনসুর আহমদ: পৃথিবীর সর্বত্র চুরি ডাকাতি, সন্ত্রাস, লুট হানাহানি, নারী সম্ভ্রম লুণ্ঠনসহ নানা ধরনের অপরাধ প্রচ-ভাবে ছড়িয়ে পড়েছে। তা থেকে বাঁচার জন্য দেশে দেশে বিভিন্ন ধরনের আইন কানুন প্রতিনিয়ত রচিত হচ্ছে। কিন্তু অপরাধের তীব্রতা মোটেই কমছে না বরং দিন দিন যেন বেড়েই চলেছে।
প্রথমেই নজর দেয়া যাক নারী সম্পর্কিত অপরাধ চিত্রের দিকে। আমাদের প্রতিবেশী গণতান্ত্রিক দেশ ভারতের ন্যাাশনাল রেকর্ডস ব্যুরোর পরিসংখ্যান অনুযায়ী ২০০৯ সালে ভারতে ধর্ষণের ২১ হাজার ৩৯৭টি ঘটনা নথিভুক্ত করা হয়েছে। ২০১০ ও ২০১১ সালে সেই সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে যথাক্রমে ২২ হাজার ১৭২ এবং ২৪ হাজার ২০৬টিতে। বর্তমানে বিভিন্ন দেশে নগ্নতা ও আত্মপ্রদর্শনীর সংস্কৃতি ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়েছে। পশ্চিমা অনেক দেশে নারীর প্রতি তাদের দৃষ্টি হলো ইনস্ট্রুমেন্টাল বা যান্ত্রিক। এ দৃষ্টিভঙ্গির কারণে মেয়ে ও নারীদের উপরে রাস্তাঘাটে নির্যাতনের মাত্রা বৃদ্ধি পেয়েছে। তাদের প্রতি যৌন নির্যাতনের মাত্রা বৃদ্ধি উদ্বেগজনকভাবে বেড়ে চলছে। মেয়েরা একাকী সেখানে রাস্তায় চলাফেরা করতে নিরাপদ বোধ করে না। মিডিয়া ও সরকারি তথ্য অনুযায়ী যুক্ত রাষ্ট্রে প্রতি বছর ৪০-৬০% কর্মক্ষেত্রে যৌন হয়রানির শিকার হয়্ আর ইউরোপে উইমেনস লবির প্রদত্ত তথ্যানুযায়ী যুক্তরাজ্যে ৪০-৫০% নারী তার পুরুষ সহকর্মীর কাছে থেকে বিভিন্ন ধরনের যৌন হয়রানির শিকার হয়। যুক্তরাষ্ট্রে প্রতি ১৮ সেকে-ে একজন স্বামী কর্তৃক প্রহৃত হয়। ইউএস জাস্টিস ডিপার্টমেন্ট-এর ১৯৮৮ সালে প্রদত্ত তথ্য অনুযায়ী যুক্তরাষ্ট্রে প্রতি বছর ৯ লাখ ৬০ হাজার পারিবারিক সহিংসতার ঘটনা ঘটে। আর প্রায় ৪০ লাখ নারী তার স্বামী অথবা বয় ফ্রে-ের দ্বারা শারীরিকভাবে নির্যাতিত হয়।
এ ভীষণ যন্ত্রণা থেকে নারী জাতিকে বাঁচাতে ইসলামী শাসনের বিকল্প কোন ব্যবস্থা নেই। ইসলামী শাসন প্রতিষ্ঠার মাধ্যমেই সমাজকে এ অপরাধ থেকে মুক্ত করা সম্ভব, যার প্রমাণ রাসূল (সাঃ০ ও তাঁর পরবর্তী খোলাফায়ে রাশেদিনের শাসনকাল।
হযরত আদী ইবনে হাতিম (রাঃ) বর্ণনা করেছেনÑ “রাসূলুল্লাহ (সাঃ) [আমাকে] বলেছেন : যার হাতে আমার প্রাণ তাঁর কসম, আল্লাহ নিশ্চয়ই এই দ্বীনকে পুরোপুরিভাবে প্রতিষ্ঠিত করে তবেই ক্ষান্ত হবেনÑ এমনকি এমন অবস্থা হবে যে, এক মহিলা একাকী হীরা (সিরিয়া) থেকে গিয়ে মক্কায় বায়তুল্লাহ তাওয়াফ করবে, আর তাকে বিব্রত করার মতো কেউই থাকবে না। আর এক জায়গায় রাসূল (সাঃ) আদী ইবনে হাতেমকে লক্ষ্য করে বলেন : “সেদিন খুব দূরে নয় যখন মানুষ সোনার টুকরা হাতে করে নিশ্চিন্তে চলাফেরা করবে এবং এ সম্পর্কে কেউ তাকে জিজ্ঞাসাও করবে না।”
হাদীসের এ সব দাবি সত্য প্রমাণিত হয়েছিল মদীনায় ইসলামী হুকুমত প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পরে। যদি বা কখন মানবিক দুর্বলতার কারণে দু’একটি ঘটনা ঘটে যেত তখন অপরাধীরা স্বেচ্ছায় বিচারের জন্য নিজেদেরকে পেশ করতো বিচারকের সামনে। মায়ায বিন মালেক (রাঃ) এবং আযদ বংশের গামেদী গোত্রের এক মহিলার এমন দু’টি বিখ্যাত ঘটনা উল্লেখ রয়েছে পবিত্র হাদীসে।
রাষ্ট্রে দ্বীন প্রতিষ্ঠিত হলে সে রাষ্ট্রে নাগরিক নিরাপত্তার কোন অভাব ঘটে না। কারণ কোরআন নির্দেশ প্রদান করে সেই জীবন পদ্ধতির যাতে হিংসা-বিদ্বেষ, নিন্দা-গীবত, উপহাস-বিদ্রƒপ, খুন-খারাবী, অত্যাচার-অবিচারের কোন অবকাশ নেই-অবকাশ নেই চুরি, ডাকাতির রাহাজানি বা পরস্ত্রী গমনের। আল্লাহর নির্দেশ, “যে কোন মুমিনকে ইচ্ছাকৃতভাবে হত্যা করে, তার শাস্তি হচ্ছে চিরস্থায়ী জাহান্নাম আর তার প্রতি আল্লাহর গজব ও লানত...। ‘চুরি করলে চোর পুরুষ বা নারীদের হাত কেটে ফেল’, ‘ব্যভিচারিণী নারী ও ব্যাভিচারী পুরুষের প্রত্যেককে একশ’ করে বেত্রাঘাত করবে।’ এসব বিধান রাষ্ট্রে চালু হওয়ার ফলে রাষ্ট্র হয়েছিল অপরাধ মুক্ত।
ইসলামী হুকুমতই একমাত্র শান্তির নিশ্চয়তা দিতে পারে। একখানা হাদীসে আল্লাহর রাসূল ফরমান : ওয়াল্লাহে লাইউতাম্মান্না হাজাল আমরু হাত্তা ইয়াসেরুর রাকেবু মিন ছুনয়ায়া ইলা হাদরা মওতা লাই ইয়াখাফু ইল্লাল্লাহা আওয়েজ জিয়বা আলা গানামিহী-কসম আল্লাহর এ অবশ্যই পূর্ণতা লাভ করবে। তখন যে কোন উষ্ট্রারোহী সানয়া থেকে হাদরা মাউত পর্যন্ত দীর্ঘ পথ নিরাপদে সফর করবে। এ দীর্ঘ সফরে সে আল্লাহ ছাড়া আর কাউকে ভয় করবে না এবং মেষ পালের ব্যাপারে নেকড়ে ছাড়া আর কাউকে ভয় করবে না। এ সত্য প্রমাণিতহ হয়েছিল রাসূল (সাঃ) ও খোলাফায়ে রাশেদার খেলাফত কালে। তা সম্ভব হয়েছিল ইসলামী সমাজের গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য ন্যায়, ইনসাফ, সঠিক লেন দেন ও ভারসাম্যপূর্ণ ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার কারণে।
অপরাধ দমনে বা প্রতিরোধে ইসলামের বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। এ ব্যাপারে ইসলামের যে বিপুল জ্ঞান, তত্ত্ব ও আইন সম্পদ রয়েছে তা সর্বপ্রকার অপরাধ দমনের জন্য যথেষ্ট। যে সব অবস্থা মানুষকে অপরাধের দিকে প্ররোচিত করে, বিভিন্ন পন্থায় ইসলাম তা দূর করতে চেষ্টা করে। আবার শান্তি নির্দেশের পূর্বে ইসলাম প্রথমত যে সমস্ত পরিস্থিতি ও মনোবৃত্তি মানুষকে অপরাধের দিকে পরিচালিত করে সেগুলো পরিশোধনের চেষ্টা করে।
ইসলাম সর্বপ্রকার অন্যায়, অপরাধ এবং মানবতাবিরোধী অশ্লীল কর্মকা- থেকে বিরত থাকার উপদেশ দিয়েই ক্ষান্ত হয়নি; এর ফলে মানব সমাজ কী ধরনের বিপর্যয়ের মুখোমুখি হতে পারে তা যুক্তিসহকারে মানুষের সামনে তুলে ধরেছে এবং ইসলাম অবলম্বিত সংশোধন ও পবিত্রকরণ প্রক্রিয়ার পূর্ণ প্রয়োগ সত্ত্বেও যদি মানুষ সংশোধিত না হয় তাহলে তাকে অবশ্যই নির্দিষ্ট দ-ে দ-িত করা হবে। ইসলাম এ সব অপরাধ প্রতিরোধসহ দৃষ্টান্ত স্থাপনকারী কঠোর শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশ দিয়েছে। খোলাফায়ে রাশেদার পরে যখন দেশে দেশে ইসলামী শাসনের অবলুপ্তি ঘটল এবং ইসলামের অনুশাসন থেকে রাষ্ট্র সরে দাঁড়াল তখন সমাজে অন্যায় পাপাচার পুনরায় মাথাচাড়া দিয়ে উঠল।
তবে এ কথা ঠিক যে, ইসলামী শাসন ব্যবস্থা অবলুুপ্তি হলেও মুসলমান শাসকরা কোরআনের আলোকে কিছুটা আলোকিত হওয়ার কারণে তাদের রাষ্ট্রের সুশাসন ছিল বেশি ঈর্ষণীয়। উমাইয়া, আব্বাসীয় শাসনকাল বাদ দিয়ে যদি ভারতের মুসলিম শাসনকালের দিকে তাকাই তাহলেও এ সত্য প্রতিভাত হবে। ভারতে মুসলিম শাসনকালের প্রশংসা করতে গিয়ে ঐতিহাসিক প-িত সুন্দরলাল বলেন, ‘আকবর, জাহাঙ্গীর, শাহজাহান এবং তাদের পরে আওরঙ্গজেব ও তার উত্তরাধিকারীদের শাসনামলে হিন্দু মুসলিম সবাই সমান সুযোগ ও সুবিধা ভোগ করে। তখন উভয় ধর্মকে সমানভাবে সম্মান করা হতো। ধর্মের কারণে কারো সাথে কোন প্রকার বৈষম্য ও পক্ষপাতিত্ব করা হয়নি। স¤্রাটদের পক্ষে থেকে বহু মন্দিরের জন্য জায়গার লাখেরাজ সম্পত্তি প্রদান করা হয়। ভারতে এমন বহু মন্দির এখনো আছে, যার পূজারীদের কাছে আওরঙ্গজেবের স্বাক্ষরিত আদেশনামা ও কপি বিদ্যমান, যেখানে মন্দিরের জন্য সরকারি অনুদান বা জায়গীর প্রদানের কথাটি স্পষ্টভাবে উল্লেখিত আছে। [শেখ আজিবুল হক, আওরঙ্গজেব, ধর্মনিরপেক্ষতা ও ইসলাম, পুনরুদ্ধৃত, ইসলামী ফাউন্ডেশন পত্রিকা-৪০ বর্ষ প্রথম সংখ্যা।]
স্যার পিসি রায় বলেন, ‘মুসলিম শাসনামলে প্রশাসনের পদ বণ্টনে ধর্ম বা গোত্রের ব্যবধান ছিল না। হিন্দু রাজার দরবারে মুসলিম উজির, মুসলিম রাজার দরবারে হিন্দু উজির সর্বত্র দেখা যেত।’ (ইসলামী ফাউন্ডেশন পত্রিকা-৪০ বর্ষ প্রথম সংখ্যা।
পিছনের দিকে না তাকিয়ে যদি হাল আমলের সৌদি আরবের দিকে তাকাই তা হলে দেখা যাবে যে ইসলামী বিধানের কিয়দংশ সৌদি আরবে চালু থাকায় সেখানকার অপরাধ চিত্র ভিন্ন। ‘সৌদী স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কেন্দ্রীয় পরিসংখ্যান বিভাগ কর্তৃক প্রকাশিত সর্বশেষ পরিসংখ্যানের ইয়ারবুক [৮৭-এ] বলা হয় যে, হত্যা, হত্যা প্রচেষ্টা, অপহরণ ইত্যাদির ন্যায় মারাত্মক ঘটনা সৌদি আরবে সংঘটিত মোট অপরাধের দুই শতাংশেরও কম।... যানবাহন দুর্ঘটনার হার হ্রাস সম্পর্কে বলা হয় ১৯৭৫ সালে যেখানে প্রতি ১০ হাজার গাড়িতে ২৬৫ দুর্ঘটনা ঘটেছে, সে তুলনায় ১৯৮৬ সালে মাত্র ৭৫টি দুর্ঘটনা ঘটে। সৌদি আরবে একই সময় গাড়ির সংখ্যা ৫ লাখ ১৪ হাজার থেকে ২৮ লাখ ৩৫ হাজার ২৩০টিতে বৃদ্ধি পাওয়া সত্ত্বেও যানবাহন দুর্ঘটনা সেখানে হ্রাস পেয়েছে এবং অন্যান্য অপরাধ হ্রাসের মাত্রাও অনুরূপ।” (চিন্তাধারা জুলফিকার আহমদ কিসমতী] সৌদি আরবের এ চিত্র আমাদেরকে জানিয়ে দেয় যে, ইসলামী বিধানের বাস্তবায়নই সমাজকে অপরাধমুক্ত করার একমাত্র পথ।